বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত

ভোক্তা পণ্যে ২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা

বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ২০২৪ সালের বিভিন্ন ধরনের বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছিল, যার রেশ চলতি বছর অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ২০২৪ সালের বিভিন্ন ধরনের বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছিল, যার রেশ চলতি বছর অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হতে পারে এ সংকটে। এতে খাদ্য ও পানীয়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য ২০২৫ সালে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে সতর্ক বলে করে দিয়েছে শিল্প সংস্থা চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড সাপ্লাই (সিআইপিএস)। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহে চলতি বছরে বাধা হিসেবে বিরাজ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মতো ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সরবরাহ চেইনের বিঘ্ন ও সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত সমস্যা। এসব কারণে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সিআইপিএস।

১৫০ দেশের ৬৪ হাজার সদস্য প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা ও সরবরাহ চেইনের প্রতিনিধিত্ব করে গবেষণা পরিচালনাকারী সংস্থাটি। তারা বিস্তৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, চলতি বছরে খাদ্য ও পানীয়সহ পণ্য সংগ্রহ এবং সরবরাহের খরচ এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অতিরিক্ত এ খরচ তুলে আনতে ভোক্তাদের ওপর নির্ভর করবেন ব্যবসায়ীরা।

গত নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই যদি আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ বাস্তবায়ন করেন তবে দৈনন্দিন পণ্যের দাম আরো বেড়ে যেতে পারে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ বাড়ছে। কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার কথা জানিয়েছে কোম্পানিগুলো। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় লোহিত সাগর এড়িয়ে চলছে বড় শিপিং সংস্থাগুলো। রুট পরিবর্তন করে তাদের জাহাজগুলো উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে চলাচলে বাধ্য হচ্ছে। এতে জাহাজ মালিকদের আয় ও মুনাফা বাড়লেও যাত্রার খরচ এবং সময় বেড়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের হাজার হাজার বন্দরকর্মী আবারো ধর্মঘট কর্মসূচি শুরুর হুমকি দিচ্ছেন। গত অক্টোবরে তারা এক দফা কর্মবিরতি পালন করেন। বর্তমানে নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে চুক্তি বিষয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এ প্রেক্ষাপটে যেকোনো অসন্তোষ নতুন করে কর্মবিরতির দিকে যেতে পারে, যা পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে বড় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

সিআইপিএসের প্রধান নির্বাহী বেন ফ্যারেল বলেন, ‘আমাদের গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট, এমন অনেক কৌশলগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা পণ্য ও সেবার মসৃণ প্রবাহ ব্যাহত করার আশঙ্কা তৈরি করছে। এগুলো বিশেষত ভোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যদি কার্যকরভাবে সামাল দেয়ার পদক্ষেপ না নেয়া হয়, সম্ভবত তারা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈশ্বিক আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়নের আগেই সুবিধা নিতে চাইছে অনেক কোম্পানি। ওইসব কোম্পানি শুল্ক পরিবর্তনের আগে কনটেইনার শিপমেন্ট বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

তবে বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ ততটা টেকসই হবে না। কেননা মজুদ করার মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ শুধু কিছু সময়ের জন্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিলম্বিত করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যেকোনো নতুন শুল্ক খরচ বাড়িয়ে তুলতে পারে, বাণিজ্য প্রবাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং মার্কিন রফতানির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ উসকে দিতে পারে।

এরই মধ্যে চীন পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানোর বার্তাও দিয়েছে। গত মাসে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছিলেন, বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো পক্ষই বিজয়ী হবে না। তিনি বলেন, ‘শুল্কযুদ্ধ, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং প্রযুক্তিযুদ্ধ ঐতিহাসিক প্রবণতা ও অর্থনৈতিক আইনবিরোধী এবং এগুলোয় কোনো জয়ী নেই।’

এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একাধিক বিকল্পের প্রস্তাব করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও নীতিনির্ধারকরা। সেখানেও পাল্টা শুল্কের বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এরই মধ্যে চীনা বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের কারণে ইউরোপের কিছু পণ্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে বেইজিং। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা যেকোনো অঞ্চলের শুল্ক বাস্তবায়নের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বহুমুখী অভিঘাতের মুখোমুখি হতে পারে।

সিআইপিএস সাম্প্রতিক জরিপে সদস্যদের মন্তব্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শুল্কের খরচ বিবেচনা না করেও যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, কম্পিউটার উপকরণ ও ধাতব পণ্যের খরচ সামনের মাসগুলোয় ৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বেন ফ্যারেলের মতে, প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তা আস্থা ধরে রাখতে হলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকদের আরো দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোর প্রবৃদ্ধি অব্যাহত এবং ভোক্তা আস্থা বজায় রাখতে হলে কিছু বিষয় দক্ষভাবে সামাল দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের কারণে বাণিজ্য প্রবাহের ওপর প্রভাব, রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি, দক্ষ কর্মী বা পেশাদার আকর্ষণে বৈশ্বিক যুদ্ধ ও অন্যান্য চ্যালেঞ্জ।’

আরও